কথাসাহিত্যপ্রচ্ছদ

ইরাবতীর কণ্ঠ- হোসেইন আজিজ- অলুগল্প

মাসুদের বিয়ে নিয়ে ভয়টা কোনো সাধারণ ভয় ছিল না।তা ছিল রাতের আঁধারে গা ছমছম করা এক অনুভব।যেখানে বিবাহিত পুরুষদের চোখে সে দেখেছিল এক অদ্ভুত বিষাদ। যেন তারা এক নীরব বন্দিশালায় বন্দী।
যে বন্দিশালার প্রাচীর বানানো স্ত্রীর অভিযোগে আর ছাদ ছিদ্র করে বৃষ্টির ফোঁটার মতো পড়ে স্তব্ধতা।

স্ত্রী নামক প্রাণীরা নাকি ঘাড়ত্যাড়ামিতে ওস্তাদ। প্রশ্ন দিয়ে প্রশ্নের জবাব দেওয়া, হ্যাঁ-কে না বলা আর সবকিছুতে দ্বিমত পোষণ করা তাদের মজ্জাগত। ‘হ্যাঁ’ শব্দটি যেন তাদের অভিধানে দীর্ঘকাল নিখোঁজ। তাই মাসুদ ভাবত– সংসার তার নয়। ভালোবাসার গল্প তার জন্য লেখা হয়নি।

সে নিজের মতো গড়ে তোলে এক সাম্রাজ্য। চলনসই একটা ব্যবসা, কিছু সাফল্য আর চারপাশে নিঃসঙ্গতার কাচঘেরা একটি দেয়াল।

একদিন ফোন কোম্পানির বিল বিভ্রাটে ডায়াল করে কাস্টমার কেয়ার এর নম্বরে। ওপাশ থেকে ভেসে আসে এক নারীকণ্ঠ।
– হ্যালো, আমি ইরাবতী আপনার সেবায় নিয়োজিত। বলুন স্যার, আপনার জন্য কী করতে পারি!

স্নিগ্ধ, শান্ত, অদ্ভুত এক মায়াবী কণ্ঠ! সে কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যেন কেউ বহু জন্ম ধরে তাকে চেনে।

মাসুদ রাগান্বিত স্বরে তার অভিযোগ জানায়। মোহময়ী কণ্ঠ কোমল স্বরে বলে – স্যার, একটু সময় দিন, আমি বিষয়টি দেখছি। মাসুদ যতই চোটপাট দেখায়, মধুর কণ্ঠী ততই স্যার স্যার বলে তাকে জবাব দেয় আর বারবার দুঃখ প্রকাশ করে।

সেই মোহন মধুর কণ্ঠ শুনে মাসুদ অবাক হয়, স্তব্ধ হয়। তার হৃদয়ের পুরনো ভয়ের বরফ গলে যেতে থাকে। সে ভাবে—এই কণ্ঠের মালিকই বুঝি তার নিয়তি। তাকে খুঁজে পেতে হবে। জানতে হবে তার আদ্যপান্ত, সব।

নাম ইরাবতী। ডাকনাম ইরা। নামেই ছিল নদীর নরম প্রবাহ, যে নদীর ধারে দাঁড়ালে বোঝা যায়— জলের নীচে লুকিয়ে থাকা গহীন স্রোতের বহমানতা।

পরিবারের সেতুতে গড়ে ওঠে সম্পর্ক। আলাপ আলোচনা, অতঃপর বিয়ে। সবকিছুই যেন ছিল খুব হিসেবি, তবু কোথাও এক অলিখিত মায়া জড়িয়ে ছিল। তারা হানিমুনে যায় দূরে, সমুদ্রের পাশে। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে মাসুদ ভাবে—এই বুঝি সেই শান্তি, যে শান্তি সে খুঁজেছিল সারাজীবন। হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে জাগে তার মনে।

কিন্তু মাস ছয়েকের মাথায় গল্প নিয়ে নেয় ভিন্ন মোড়। ইরাবতীর কণ্ঠস্বর বদলে যায়, হারিয়ে যায় তার কণ্ঠের সেই মোহনীয়তা। তার ভালোবাসার সংজ্ঞাও বদলে যায়।

ইরাবতী মেতে ওঠে তার বান্ধবীদের নিয়ে, সময় কাটায় হৈ-হুল্লোড় করে। মাসুদ তার ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেও ইরাবতীকে সাধ্যমত সময় দেয়ার চেষ্টা করে। কোনো সময় বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইলে ইরাবতীর কাছ থেকে শুনতে হয় বিভিন্ন অজুহাত।

– চলো, আজ লং ড্রাইভে, বেড়িয়ে আসি।
– না, আজ ভালো লাগছে না।

– চলো, ডিনারে বাইরে যাই।
– না, খুব মাথা ব্যথা করছে। অন্যদিন যাবো।

– একটু বসো, গল্প করি।
– না, কথা বলার বা শোনার মোড নেই।

সবকিছুর মাঝে যেন উপস্থিত এক অদৃশ্য ছায়া। ইরাবতীর স্বভাবে এড়িয়ে চলা, কথায় অজুহাত আর ‘না’ এর ছড়াছড়ি। মাসুদের মনে নিঃশব্দে ফিরে আসে সেই পুরনো ভয়।

একদিন এক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে মাসুদ ইরাবতীকে জিজ্ঞেস করে,
– তুমি তো এমন ছিলে না, ফোনের ওপাশে যে ছিল, সে কোথায় হারিয়ে গেল?
ইরাবতী তার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে,
– ফোনের ওপাশে আমি ছিলাম ঠিকই। কিন্তু ওটা আমার ভূমিকা ছিল, আমার সে কণ্ঠ কৃত্রিম ছিল। তুমি আমার কণ্ঠে প্রেম খুঁজেছিলে কিন্তু আমি তো কেবল দায়িত্ব পালন করছিলাম। ফোন কোম্পানির শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো আওড়ে যাচ্ছিলাম।

সেই রাতে মাসুদ আর ঘুমাতে পারে না। সে জানলায় গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশের তারাগুলোও আজ যেন বড়োই ম্লান। তার মনে হয়– সেই কণ্ঠ, সেই ইরাবতী আজও কোথাও বেঁচে আছে। কিন্তু এই বাস্তবতা! এই ইরাবতীকে শুধু নিঃসঙ্গতার আরকটি নাম বলে মনে হয়।

মাসুদ বুঝে যায়, ভয়ের অভিধান সে যতই ছেঁটে ফেলুক,
কিছু শব্দ থেকেই যায়— ‘কৃত্রিমতা’, ‘না’ আর ‘একাকীত্ব’।

আরও পড়ুন- পার্থ প্রতিম দে’র গল্প দহনকাল

You cannot copy content of this page