বন্ধন- আইনূর রহমানের গল্প
‘সুশীল টর্চ লাইটটা নে আয় তো, গোলঘরের পাশে কী যেন শব্দ হচ্ছে!’ তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। অন্ধকার তেমন গাঢ় নয়। তবুও নেত্যবালা বুঝতে পারল না তার ছাগলের গোয়াল ঘরের পিছনে কিসের শব্দ হচ্ছে ।একটু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে শব্দটা শোনার ও বোঝার চেষ্টা করল। এবার সে স্পষ্ট শুনতে পেল-’ বাবা বাঘ, বাবা বাঘ।’সে আর এক পা ও এগোবার সাহস পেল না। সুশীল তাড়াতাডি টর্চটা মায়ের হাতে দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ‘কিছু শুনতে পাচ্ছিস?’ ‘হ্যাঁ মা। চলো ওই শিরিষ গাছের কাছ থেকে লাইটটা মারি।’ টর্চ জ্বালিয়ে দেখল কে একজন গোয়াল ঘরের বেড়ার গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে। মা ছেলে এই দৃশ্য দেখে দুজনে ধীরে ধীরে এগুতে লাগল। কাছাকাছি এসে দেখল একটা দশ-এগারো বছরের ছেলে প্রায় অচেতন ভাবে পড়ে আছে। মুখে শুধু বলেই চলেছে-’বাবা- বাঘ, বাবা-বাঘ।’নেত্যবালা ছুটে গিয়ে দেখে ছেলেটার দু-পা রক্তাক্ত। তারা দুজনে মিলে ধরাধরি করে ছেলেটাকে বাড়িতে নিয়ে গেল।
বাড়িতে গিয়েই গ্রামের অনুকুল ডাক্তারকে অনুনয় বিনয় করে ডেকে নিয়ে এল। ডাক্তার এসে দেখলেন ছেলেটার ডান ও বাম পায়ের কাফ মাসলে ধারাল অস্ত্রের আঘাত। ড্রেসিং করতে করতে তিনি লক্ষ্য করলেন ছেলটি আস্তে আস্তে চোখ মেলছে। জিজ্ঞাসা করলেন,’কী করে এমন হল বাবা?’ছেলেটি কোন উত্তর দিল না।’খোকা,তোমার বাড়ি কোথায়?তোমাকে তো এ তল্লাটে কখনো দেখিনি।’সে আগের মতোই নীরব হয়ে শুয়ে রইল। ডাক্তার তার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আঘাতের জায়গাগুলো ব্যণ্ডেজ করে কটি ওষুধ আর জল তার মুখে দিয়ে প্রেস্ক্রিপশন লিখে দিয়ে বললেন, ‘অনেকটা রক্তপাত হওয়ার কারণে খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে, ওষুধ গুলো নিয়মিত খাওয়াবেন, সেরে যাবে।’ কথাগুলো বলে ডাক্তার চলে গেলেন।
সপ্তাহ পর। সকালবেলা নেত্যবালা প্রাতরাশে ছেলেটাকে দুটো রুটি আর আলু বেগুনের তরকারি খেতে দিল। ডাক্তারের নির্দেশানুসারে ওষুধগুলো খাইয়ে দিয়ে প্রতিদিনের মতোই জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার নাম কী খোকা? চুপ করে থেকো না আমার কথার উত্তর দাও।কথা না বললি আমি জানব কী করে তোমার কেন এই বিপদ হলো । আমরা তোমার ভালো চাই।’ছেলেটি বলল,‘আমার নাম দাশু। দাশু কাহার।’
‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
দাশু উদাস হয়ে বলল,‘আমার তো কোন বাড়ি নেই।’
‘বাড়ি নেই মানে! তুমি কোথায় থাকো?’ ‘তালদি স্টেশনের-দুই নং পেলাটফমের(প্ল্যাটফর্ম) নীচে।’
‘পেলাটফমে থাকো কেন? তুমি আগে কোথায় থাকতে? মানে তুমি কোত্থেকে এসছো?’
‘গোসাবা থেকে।’
‘তোমার বাবা, মা, ভাই, বোন…?’
‘না,কেউ নেই।’
‘তোমারে কে এমন করে আঘাত করেছে?’
‘একটা আনকা লোক।’
‘কেন?’
‘আমার কাছে ভিক্ষে করা কিছু টাকা ছেলো, সেগুনো কেড়ে নিতে এসছেলো। বাধা দিতে দিতে এইদিকে দৌড়োচ্ছিলুম,তখন পড়েও গেছিলুম। সেই সময় পেছন থেকে এসে পায়ে ছুরি মেরে টাকাগুলো কেড়ে নে চলে গেছে। তখন খুব মাথা ঘুরছেল হাঁটতে পাচ্ছিলুম না,তাই হামা দিতে দিতে একটা গোলঘরের পিছনে এসে বসে পড়েছিলুম।
নেত্যবালা বেশ কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল তারপর কোমল ভাবে বলল, ‘ডাক্তার বলেছে, তোমার পায়ের আঘাত সাংঘাতিক, তুমি এখন হাঁটতে পারবে না । তোমার চিকিজ্জে করতি হবে অনেকদিন ধরে।আমরা তো স্বামী স্ত্রী দুজন সকালবেলা বার হই আর সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরি। সারাদিন মুটে মজুরের কাজ করি। তেমন আয় রোজগার নেই।আমার ওই ছেলেটা কারখানায় কাজ শেখে। এখন ছুটি তাই বাড়িতে আছে। ছুটি শেষ হলি আবার চলে যাবে। বাবা, তাহলি তোমার আমরা কী করে চিকিজ্জে করা, লক্ষ্য রাখা,সেবা যত্ন করার কাজটা করি বলোতো? তাই বলি তোমারে তোমার গেরামের বাড়িতে দে আসি। সেখেনে যারা আছে তোমার দেখাশোনা করবেক্ষণ।’
এই কথা শুনে দাশু অসহায় ভাবে নেত্যবালার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বলল,’বাড়িতে যে আমার কেউ নেই।’
‘তোমার বাবা মা কোথায় গেছে?’
‘আমি যখন হয়েছিলুম তখন মা বাবারে ছেড়ে চলে গেছে।’
‘কোথায় চলে গেছে?’
‘আমি জানি নে। বাবাও জানত না।’
‘আর তোমার বাবা?’
‘বাবাকে বাঘে টেনে নে গেছে।’
‘অ্যা!’ আত্মকে ওঠে নেত্যবালা।তার মুখে বিস্ময় মাখা সহানুভূতির চিহ্ন ফুটে ওঠে ।ছেলেটির প্রতি তার করুণাও জাগে।
‘বলো কী!’ একটা কৌতূহল মেশা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সে দাশুর দিকে চেয়ে থাকে।দাশু এবার বলতে শুরু করে-
‘বাবা আর আমি নৌকা ভাড়া করে পতিদিন মাছ ধরতুম। মাছ যা পাওয়া যেতো তা বিক্রি করে আমাদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা হতো।একদিন সকালবেলা আমরা বার হয়ে সোঁতা দিয়ে সুন্দরখালির চরের দিকে নৌকা নিয়ে যাচ্ছিলুম। ওই সময় আমি নৌকায় আর বাবা গুন টানতেছিল।
হঠাৎ দেখি বাবার পিছনে ঝোপের আড়ে বাবাকে লক্ষ্য করে একটা বাঘ হামা দেচ্ছে। আমি খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠেছিলুম- ‘বাবা বাঘ। বাবা বাঘ, বলে।’সঙ্গে সঙ্গে বাঘটা বাবার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নে চলে গেছলো।আমি নৌকায় বসে কাঁদছিলুম।এই সময় পরান কাকা আর তার ছেলে মধু মাছ ধরে ফিরছেলো। তারা আমারে বাড়ি নিয়ে এসছেলো। তারপর থেকে আমার ঠিক মতো খাওয়াই জুটত না ।জ্যেঠু আমারে মাঝে কদিন খাওয়া দেছলো। হঠাৎ একদিন দুপুরে ভাত চাতে গেলে বলে,’মোর তাই খাওয়া জোটে কী জোটে না তুই শুধু ভাত ভাত করতেছিস।’ তারপর কদিন আমারে খাওয়া একদিন দেয় কী দুদিন দেয় না। শেষ কদিন তো খেতেই দেয় নি। তাই সহ্য কত্তি না পেরে বেইরে পড়েছিলুম।এখন টেনে টেনে গান গেয়ে ভিক্ষে করি আর খাই।’
নেত্যবালা কথাগুলো মন দিয়ে শোনার পর বলল,’সব তো বুঝলুম বাবা। আমাদের অবস্থাও তো তুমি নিজের চোখি দেখতিছো। তোমারে কী করে আমরা এখানে রাখি আর চিকিজ্জে করি বলো? সে সামত্থো আমাদের নেই। তোমারে বরন আমি তোমার বাড়িতে নে যাই। তারপর দেখি কী করা যায়। যাবার সময় তুমি আমারে এক এক করে বলবে কীভাবে কোন পথ ধরে তালদি এসছেলে। আমি সেই পথ ধরে তোমারে নে যাবো।’
বেশ অর্থ কষ্টের সত্বেও নেত্যবালা একটা টোটো গাড়ি ভাড়া করে দাশুকে নিয়ে গেল খেয়াঘাট পর্যন্ত। তারপর পথ চলতি মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় নৌকা আর মোটর রিক্সা করে দাশু যে পথ দেখাচ্ছিল সেই পথে উদ্বিগ্ন ও চিন্তান্বীতভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল।অবশেষে যে অঞ্চলের দিকে দাশু তাকে পথ দেখালো তার নাম দরাজখালি। যেখানে ছিল নেত্যবালার আগের শ্বশুরবাড়ি। সে হতবাক ও কিছুটা শঙ্কিত ভাবে পাথরের মূর্তির মতো রিক্সায় বসেছিল। যখন বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর তখন তারা জলডাঙা গ্রামে এসে পৌঁছালো।দেখল সে তার শ্বশুরবাড়ির প্রাঙ্গণের নিকটেই এসে গাড়িটা দাঁড়িয়েছে। দাশু নেত্যবালার শ্বশুরের দেওয়া জমার উপর তাদের স্বামী-স্ত্রীতে গড়া বাড়িটিকেই নিজের বাড়ি বলে দেখালো। তৎক্ষণাৎ নেত্যবালার সারা শরীরে হীমপ্রবাহ বয়ে গেল। দেখল উঠোনের কোণে বড়ো হয়ে ওঠা কাঁঠাল গাছের গোড়ায় সেই পুরানো হালটা এখনো ঠেকো দেওয়া আছে।
ঘরের পুবদিকের জাঁফরির বেড়ার গায়ে সেই ছেঁড়া জালটার কিছু অংশ বাতাসের ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে দুলছে। আর দেখল উঠোনের মাঝে দড়িতে টাঙানো কতগুলি নতুন ভিজে কাপড় শুকানোর জন্য মেলে দেওয়া আছে। বারান্দায় সদ্য বোনা একটা খেজুর পাতার পাটি বিছানো আছে। সে বুঝতে পারল তার ঘরে কেউ বাস গেড়েছে। স্মৃতির রেখা ধরে কতো কথা তার মনে ভিড় করে এলো। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ জলে ভরে গিয়েছিল ।এক মহাশূন্যতা তাকে একেবারে গ্রাস করে নিল।
অতি পাতলা বসতি হওয়ার সত্ত্বেও কৌতূহল বশত বহু আগে থেকেই অনেকে তাদের পিছু নিয়েছিল।হঠাৎ একজন মহিলা দাশুকে জিজ্ঞাসা করল- ‘দাশু,তোর মাকে ক্যামনে চিনলি রে? কোত্থেকে ধরে আনলি ? ওর মনে হয় শখ মিটে গেছে। আবার কার জন্যি পালাবে কে জানে। ওরে বিদেয় হ রে পোড়ামুখী বিদেয় হ। এই ভিটে থেকে এখনি বিদেয় হ অলক্ষুণে- ভাতারখাকী-রাক্ষুসী!’ একটা ঘৃণা ও তীব্র ধিক্কার সূচক ধ্বনি কানে যাওয়া মাত্র নেত্যবাল সম্বিত ফিরে পেল।পেছন ফিরে দেখল ভাদ্রবৌ আরো অনেকে। সকলেই তাচ্ছিল্যের চাউনিতে চেয়ে আছে তার দিকে। কথাগুলো সে বেশ জোরে জোরে সবাইকে শুনিয়ে বলছিল। নেত্যবালা অনিচ্ছার সত্ত্বেও মৃদু স্বরে প্রায় স্বগতোক্তি করলো,’আমরা থাকব না দিদি,আমরা থাকতে আসিনি। তোমাদের দেখতে এসেছি।’
আরও পড়ুন- কুয়াশার ঘর রহস্য গল্প
