দহনকাল- পার্থ প্রতিম দে- গল্প
রাত অনেক গড়িয়েছে। শহর ঘুমিয়ে পড়েছে অনেক আগেই।
অর্কের ঘুমটা ভাঙল হঠাৎ মোবাইলের আলোতে।
স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটা নাম—
নীলা।
এই নামটা বহু বছর ধরে অর্কের জীবনের ভেতর এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি হয়ে আছে।
মাঝেমধ্যে নীরব হয়ে যায়, আবার হঠাৎ ফিরে আসে।
এত রাতে ফোন?
মনের ভেতর একের পর এক আশঙ্কা মাথা তুলতে লাগল। ঘুম এখনও পুরোপুরি কাটেনি;
মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কল রিসিভ করতেই নীলার ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার শব্দ যেন অর্কের
মস্তিষ্কের নিউরনগুলোতে ঝড় তুলল। এমন চাপা কান্না—যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে
অসংখ্য অজানা অর্থ।
— কী হয়েছে নীলা? ফারহান কি কিছু বলেছে?
ওপাশে কোনো উত্তর নেই। শুধু থেমে থেমে কান্নার শব্দ।
— কিছু তো বলবে?
অর্কের কণ্ঠে অজান্তেই একটু বিরক্তি ঝরে পড়ল।
মৃদু স্বরে, কান্না সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টায় নীলা বলল,
— আমি আর পারছি না অর্ক… আমি আর পারছি না।
কথা শেষ করতেই তার কান্না যেন আরও বেড়ে গেল।
অর্ক নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে করল। দূরত্ব আর সময়—দুটোই এমন যে চাইলেই এখন
নীলার কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কোনো একটা অদৃশ্য যন্ত্রণা
মেয়েটাকে ভিতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।
— আচ্ছা, আগে কান্না থামাও। কী হয়েছে বলো…
নীলা আবারও চুপ।
নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রেখে অর্ক আবার বলল,
— তুমি কিছু না বললে আমি বুঝব কীভাবে? আর যদি কিছুই না বলো, তবে আমি ফোন রাখছি।
কিছুক্ষণ পর নীলা বলল,
— আমি মনে হয় ফারহানের সাথে খুব অন্যায় করছি… খুব।
কান্না জড়িয়ে আছে তার কণ্ঠে।
— অন্যায়? কী হয়েছে খুলে বলো। ফারহান কি কিছু বলেছে তোমাকে?
অর্ক কিছুটা বিস্মিত।
— না, ও কিছু বলেনি। আজ হঠাৎ ও আমার কাছে আসতে চেয়েছিল… আমি কিছুতেই তা
মেনে নিতে পারছিলাম না।
— কাছে আসতে চেয়েছিল মানে? সে কি তোমার ওপর জোর খাটিয়েছে?
— না না, জোর করেনি… কিন্তু অনেকদিন পর…
বাকিটা বলতে পারল না নীলা। কণ্ঠ আবার কেঁপে উঠল।
ফারহান মানুষ হিসেবে ভীষণ ভালো—সম্ভবত স্বামী হিসেবেও। তবুও নীলা কেন যেন
বারবার ফিরে যেতে চায় অর্কের কাছে।
ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে তারা। বন্ধুত্বের হাত ধরেই জন্ম নিয়েছিল প্রেম। আট
বছর ধরে কী দারুণ প্রেমই না করেছে তারা! অথচ হঠাৎ একদিন, অজানা কোনো কারণে,
পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নীলা বিয়ে করে ফারহানকে।
সেদিনগুলোর কথা আজও ভুলতে পারে না অর্ক।
কী নিদারুণ অসহায়ত্ব তাকে গ্রাস করেছিল!
একসময় সে ভেবেই নিয়েছিল—এই জীবন রেখে আর লাভ কী? যে পৃথিবীতে নীলা তার নয়,
সেই পৃথিবীকে নিজের মনে করা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল তার কাছে।
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছিল সে।
তারপর কেটে গেছে বহু বছর। মাঝে মাঝে শিবলীর কাছে নীলার খবর পেত অর্ক। শুনত—নীলা
ভালো আছে, সুখে আছে। সেই খবর শুনে ভালোও লাগত, আবার বুকের কোথাও হাহাকারও
জেগে উঠত।
এরপর একদিন নীলা আবার ফিরে এল—তবে পুরোপুরি নয়।
— অনেকদিন পর কী?
অর্ক জানতে চাইল।
নীলা চুপ করে রইল।
অর্ক বুঝে নিল—অনেকদিন পর নীলা আর ফারহানের শরীরের দূরত্ব ঘুচেছে।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এ সম্পর্ক তো খুবই স্বাভাবিক। তবু ভাবতেই বুকের ভেতর কেমন এক
চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল অর্ক। মাথাটা যেন নেশাগ্রস্তের মতো দুলে উঠল।
হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল—
— তোমরা কি… ফিজিক্যালি—?
শব্দটা শ্রুতিকটু—সে জানে। তবু বলল।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর নীলা মৃদু স্বরে বলল,
— হু।
এই ছোট্ট শব্দটা যেন অর্কের কানে মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা হয়ে বাজল। তবু নিজের কষ্টটা
আড়াল করতে জানে সে।
— তো এতে সমস্যা কোথায়? ফারহান তোমার স্বামী। তার তো সেই অধিকার আছে।
নীলার কান্না আবার জোরে শোনা গেল। যেন হেমন্তের শেষে হঠাৎ নেমে আসা শীতের
বৃষ্টি—কখনো অঝোর, কখনো ঝিরঝির।
— আমি কিছুই জানি না অর্ক… আমি আর পারছি না।
অর্কের বুকের ভেতর হাহাকার জমে উঠল।
একসময় সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—নীলাকে কোনোদিন কাঁদতে দেবে না। অথচ আজ মেয়েটার
চোখের জলের পেছনে সে নিজেই যেন দায়ী।
— তুমি শান্ত হও নীলা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
— কিছুই ঠিক হবে না! কিছুই না!
আজ যখন ফারহান আমার সঙ্গে ছিল… আমি ওর জায়গায় শুধু তোমাকেই দেখছিলাম অর্ক।
আমার কাছে তখন ফারহান বলে কেউ ছিল না।
কথাটা শুনে যেন অর্কের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
— আমাকে দেখছিলে মানে?
অর্কের মনে পড়ে গেল তাদের আট বছরের প্রেমের কথা।
এই যুগে প্রেম মানেই যেখানে শরীরের উন্মুক্ততা—সেখানে অর্ক নিজেকে বারবার সংযত
রেখেছিল। সুযোগের অভাব ছিল না। তবু সে নীলার প্রতি নিজের ভালোবাসাকে কলঙ্কিত
করতে চায়নি।
একবার রাগ করে নীলা বলেছিল—
“তোমার মধ্যে পৌরুষ নেই।”
অর্ক হেসে বলেছিল—
“যদি এসব করে পৌরুষের প্রমাণ দিতে হয়, তবে ধরে নাও আমি পুরুষই নই।”
নীলা তখন তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল—
“তুমি পুরুষ নও… তুমি মহাপুরুষ।”
আজ সেই নীলাই অন্য একজনের পাশে থেকেও তাকে কল্পনা করেছে।
— হ্যাঁ, তোমাকেই দেখেছি। তোমাকেই অনুভব করেছি।
তোমার সেই পুরনো গন্ধ… যেন আমাকে ঘিরে ছিল। তোমার স্পর্শ ভেবেই আমি শিহরিত
হয়েছি। কোথাও ফারহান ছিল না।
অর্ক জানত—এই দিন একদিন আসবেই।
সেই কারণেই যেদিন নীলা আবার ফিরে এসেছিল, সেদিনই তাকে দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিল সে।
ইচ্ছে করেই অবহেলা করেছিল। নিজেকে যতটা সম্ভব নিচে নামিয়েছিল—শুধু যাতে নীলা ভুল
বুঝে ফিরে যায় নিজের জীবনে।
কারণ ফারহান তাকে সব দিয়েছে—সুখ, নিরাপত্তা, প্রাচুর্য।
তবু অতিরিক্ত সুখও কখনো কখনো মানুষের নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়।
নীলা অনুভব করেছিল—ফারহান তাকে ভালোবাসলেও যেন এক অদৃশ্য কাঁচের বাক্সে
সাজিয়ে রেখেছে। যেন সে এক শোকেসের পুতুল।
মানুষ হিসেবে তার অস্তিত্ব কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল।
এই দমবন্ধ করা জীবন থেকে মুক্তি খুঁজতে খুঁজতেই একদিন আবার দেখা হয়ে যায় অর্কের
সঙ্গে।
— এটা তোমার অন্যায় নীলা।
ফারহানের তো কোনো দোষ নেই। তুমি ফিরে যাও।
কষ্ট চেপে বলল অর্ক।
— ফিরে যাব মানে?
— ফারহানের কাছে ফিরে যাও। আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
— আর তুমি?
প্রশ্নটা শুনে অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
— আমার কথা ভাবতে হবে না। তুমি সুখে থাকলেই আমি সুখে থাকি।
— তুমি কি সত্যিই তাই চাও?
অর্ক চুপ করে রইল।
— আমি ফিরে গেলে তুমি খুশি হবে?
দীর্ঘ নীরবতার পর অর্ক বলল—
— হুম।
একটা মাত্র শব্দ।
তবু এই শব্দ উচ্চারণ করতে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পাহাড় টপকাতে হলো তাকে।
— আচ্ছা… তবে তাই হোক।
এরপরই ফোনের লাইন কেটে গেল।
মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় যেন কালবৈশাখীর ঝড় বয়ে গেছে।
খাটের ওপর নিশ্চুপ বসে আছে অর্ক। ঘর ভরে গেছে সিগারেটের ধোঁয়ায়। বুকের বাঁ পাশে সেই
চেনা চিনচিনে ব্যথা।
কাল সকালেই তাকে ছাড়তে হবে এই শহর।
মোবাইলের সিমগুলো খুলে ফেলল সে—ভেঙে দিল যোগাযোগের সব সেতু।
ছোট্ট একটা চিরকুটে লিখল—
“পৃথিবীর সব নীল ভালো থাকুক।
পৃথিবীর সব সূর্য নিভে যাক—
তবুও আকাশ নীলে ভরে উঠুক।”
অর্ক বহু বছর আগে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে।
কোথায় আছে, কেমন আছে—কিছুই জানে না নীলা।
সে শুধু অপেক্ষা করে।
পৃথিবী এখন তার কাছে অন্ধকার। সূর্যের আলো ওকে আর ছুঁতে পারে না।
দহনকালের পোড়া ক্ষত সহজে শুকায় না। সময়ও থেমে থাকে না। নীলুফার এখন
প্রাপ্তবয়স্কা। ওর ভুবনে এখন সূর্যের আলো ঝলমল করে হাসে।
আরও পড়ুন- আইনূর রহমানের গল্প- বন্ধন
