কুয়াশার ঘর- ইকবাল খান- রহস্যগল্প
জাপানের উত্তরের ছোট্ট পাহাড়ি শহর নোরা। শহরটা খুব বড় নয়—চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে সরু নদী, আর পুরোনো কাঠের ঘর। শীতকালে এখানে প্রায়ই কুয়াশা নামে। সেই কুয়াশা এমন ঘন হয় যে কখনও কখনও রাস্তার সামনে দাঁড়ানো মানুষকেও দেখা যায় না।
এই শহরেই থাকত রিন নামের একজন লোক । বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। সে ছিল এক বইপাগল মানুষ। শহরের ছোট এক লাইব্রেরিতে কাজ করত। রিন ছিলো খুব শান্ত স্বভাবের। মানুষের ভিড় তার ভালো লাগত না। বই, পুরোনো গল্প আর নিস্তব্ধতা—এই তিনটিই ছিল তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
একদিন লাইব্রেরিতে পুরোনো বই সাজাতে সাজাতে রিন একটি অদ্ভুত খাম খুঁজে পেল। বইয়ের তাকের পেছনে ধুলো জমে থাকা জায়গায় খামটা লুকানো ছিল। খামটি হলুদ হয়ে গেছে, যেন অনেক বছর কেউ স্পর্শ করেনি।
রিন খামটা খুলে দেখল ভেতরে একটি ছোট চিঠি।
চিঠিতে মাত্র তিনটি লাইন—
“কুয়াশার রাতে
পুরোনো ঘর খুলবে।
যে ঢুকবে, সে আর ফিরবে না।”
চিঠির নিচে শুধু একটি নাম লেখা—”কেন”।
রিন অবাক হয়ে গেল। লাইব্রেরির নথি ঘেঁটে সে দেখল, প্রায় পনেরো বছর আগে নোরা শহরে সত্যিই একজন মানুষ হারিয়ে গিয়েছিল। তার নাম ছিল “কেন”। সে ছিল এক স্কুলশিক্ষক। এক কুয়াশাভরা রাতে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, কিন্তু আর ফিরে আসেনি।
এই ঘটনাটা শহরের পুরোনো মানুষরা এখনও ফিসফিস করে বলে।
রিনের কৌতূহল বাড়তে লাগল।
সেই সন্ধ্যায় সে লাইব্রেরির বৃদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক সো–এর কাছে গেল।
“সো সান,” রিন বলল, “কেন নামে কাউকে চিনতেন?”
সো কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন—
“চিনতাম। ভালো মানুষ ছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে গেল।”
“কেন?”
সো জানালার বাইরে তাকালেন। তখন বাইরে ধীরে ধীরে কুয়াশা নামছে।
“কেউ ঠিক জানে না,” তিনি বললেন, “কেউ বলে সে পাহাড়ে হারিয়ে গেছে। কেউ বলে… পুরোনো ঘরের ভেতর ঢুকেছিল।”
“পুরোনো ঘর?”
সো আবার চুপ।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন—
“শহরের উত্তরে এক পরিত্যক্ত কাঠের বাড়ি আছে। বহু বছর আগে সেখানে এক পরিবার থাকত। এক রাতে আগুন লাগে। সবাই মারা যায়। তারপর থেকে ওই বাড়ি আর কেউ ছুঁয়েও দেখেনি।”
রিনের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা কাঁপুনি উঠল।
রাতটা সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারল না।
বারবার সেই চিঠির কথাগুলো মনে পড়ছিল—
“কুয়াশার রাতে
পুরোনো ঘর খুলবে…”
পরদিন রাতে রিন সিদ্ধান্ত নিল সে ওই বাড়িটা দেখবে।
সেদিনও শহর কুয়াশায় ঢাকা ছিল।
রিন একটা ছোট টর্চ আর শীতের মোটা কোট নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। শহরের আলো পেছনে ফেলে সে ধীরে ধীরে উত্তরের পাহাড়ি পথে উঠতে লাগল।
চারদিকে নিস্তব্ধতা।
কেবল দূরে কোথাও নদীর শব্দ।
কিছুক্ষণ পর কুয়াশার মধ্যে সে একটা কালো ছায়া দেখতে পেল।
একটা কাঠের বাড়ি।
বাড়িটা সত্যিই খুব পুরোনো। ছাদের অনেক কাঠ ভেঙে গেছে। জানালার কাঁচ নেই। দরজাটা আধখোলা।
রিনের মনে হল কেউ যেন ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরে অন্ধকার আর ধুলো। মেঝেতে ভাঙা কাঠ ছড়িয়ে আছে। দেয়ালে পুরোনো ছবি ঝুলছে—কিন্তু ছবির মুখগুলো সময়ের সঙ্গে মুছে গেছে।
রিন টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল।
হঠাৎ তার পায়ের নিচে কিছু একটা শব্দ করল।
সে নিচে তাকাল।
একটা ছোট কাঠের বাক্স।
বাক্সটা খুলতেই রিনের শ্বাস আটকে গেল।
ভেতরে ছিল কয়েকটা পুরোনো ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“কেন”।
রিন দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।
ডায়েরিতে লেখা ছিল—
“আজ আমি সেই বাড়িতে গেলাম। সবাই বলে এখানে কেউ নেই। কিন্তু আমি শপথ করে বলতে পারি—আমি কারও পায়ের শব্দ শুনেছি।”
আরেক পাতায়—
“আজ দরজা নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেল।”
আরেক পাতায়—
“আমি আর বের হতে পারছি না। মনে হচ্ছে এই বাড়ি মানুষকে ছাড়ে না।”
রিনের হাত কাঁপতে লাগল।
ঠিক তখনই—
ধপ!
বাড়ির দরজা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
রিন দৌড়ে দরজার দিকে গেল। কিন্তু দরজা নড়ল না।
চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
তারপর সে শুনতে পেল—
ধীরে ধীরে কারও হাঁটার শব্দ।
টুপ… টুপ… টুপ…
রিন টর্চ ঘুরিয়ে চারদিকে আলো ফেলল।
কেউ নেই।
কিন্তু শব্দটা আরও কাছে আসছে।
তার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠল।
হঠাৎ টর্চের আলো দেয়ালে পড়তেই সে দেখল—
দেয়ালে নতুন একটা ছায়া।
যেন কেউ তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
রিন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
কিন্তু মেঝেতে কুয়াশার মতো সাদা ধোঁয়া জমতে শুরু করেছে।
তারপর সেই ধোঁয়ার ভেতর থেকে একটা অস্পষ্ট অবয়ব তৈরি হল।
একটা মানুষ।
রিনের গলা শুকিয়ে গেল।
অবয়বটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হল।
একটা ফ্যাকাশে মুখ।
চোখ দুটো গভীর।
সে খুব নিচু গলায় বলল—
“তুমি… আমার ডায়েরি পড়েছ?”
রিন বুঝতে পারল—এটাই কেন।
“তুমি… এখান থেকে বের হতে পারনি?” রিন কাঁপা গলায় বলল।
কেন মৃদু হাসল।
“এই ঘর মানুষকে ছাড়ে না,” সে বলল।
“কেন?”
কেন জানালার দিকে তাকাল।
বাইরে ঘন কুয়াশা।
“এই ঘর একা থাকতে চায় না,” সে বলল ধীরে। “যে এখানে আসে, তাকে ধরে রাখে… যেন সে কখনও একা না থাকে।”
রিনের মনে হল বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেছে।
“তাহলে… আমি?”
কেন উত্তর দিল না।
কেবল ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল।
শেষবার সে বলল—
“যদি দরজা খোলে… দৌড়াবে।”
ঠিক তখনই—
কড়াৎ!
দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল।
রিন এক মুহূর্তও দেরি করল না।
সে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
পাহাড়ি পথ ধরে ছুটতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর যখন সে শহরের আলো দেখতে পেল, তখন থামল।
পেছনে তাকাল।
কুয়াশার মধ্যে সেই বাড়ি আর দেখা যাচ্ছে না।
যেন কখনও ছিলই না।
পরদিন সকালে রিন আবার সেই জায়গায় গেল।
কিন্তু আশ্চর্য—
সেখানে কোনো বাড়ি নেই।
শুধু ফাঁকা ঘাস আর ভাঙা পাথর।
রিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল সবকিছু কি স্বপ্ন ছিল?
ঠিক তখন সে কোটের পকেটে হাত দিল।
ভেতর থেকে একটা জিনিস বের হল।
একটা পুরোনো ডায়েরি।
মলাটে লেখা—
কেন।
রিনের শরীর শীতল হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে ডায়েরির শেষ পাতাটা খুলল।
সেখানে নতুন করে লেখা একটি লাইন—
“আজ রাতে
নতুন একজন এসেছে।”
রিন বুঝতে পারল—
রহস্যটা শেষ হয়নি।
হয়তো কোনো এক কুয়াশাভরা রাতে
আবার সেই দরজা খুলবে।
আরও পড়ুন- ভালোবাসা এবং একটি ট্রেনের কামড়া
