পদাবলিপ্রচ্ছদ

একগুচ্ছ কবিতা- সোমা ঘোষ মণিকা

বিষন্ন হৃদয়

হৃদয় পেতে বসে আছি; কেউ ছায়া দেবে?
ঘরের পিছনে ছাতিম গাছে ঘুঘু ডাকে ভোরবিহানে।
হৃদয় আমার শুষ্ক মরুভূমি; দিনে দিনে বাড়ে
বালির স্তর।

এখানে কেউ ফুল ফুটাতে আসে না।
সবাই স্বার্থপর।

হৃদয় খুলে বসে আছি; অবেলায় কোন পাখি।
কোন সদূরে বাজায় বীণা, বিষন্ন হৃদয়ে।
কোন উদাস পাখি?

ফিরে না যাওয়া

সে চলে গেলো, কথা না বলে।
সে চলে গেলো, আর ফিরবে না বলে।
তাকে আর ফেরানো গেলো না, কোন অজুহাতে।
আমার দিন, রাতে গড়ায় তার কথা ভেবে।

তবুও সে ফিরে না, ফিরবে না
কোন অবকাশে।
সে যে চলে গেলো,
আর ফিরবে না বলে।

ক্ষমা করো-

কখনোই চাইনি, ক্ষুধাতুর চোখ দুটো বৃষ্টিতে ভিজে উঠুক।
চেয়েছি ডানা মেলে উড়তে, আমি উড়বোই,
কখনো চাইনি ভার হতে, হতে হলো।
আচ্ছা এমন কেন হলো; হৃদয় কেন ভারী হয়ে আসে?
কেন ভর দুপুরে বিষন্ন ফুল ফোটে?
কার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমার তো কেউ ছিলো না। কেউ নেই।
তবুও পায়ে কিসের বেড়ি?
নেই কোন পিছুটান, আমি গাইতে জানি, লিখতে জানি, ভাবতে জানি।
এতোটা জানাজানি তো আর কারো নেই।
তবুও বড়ো শূন্য শূন্য ঠেকে;
বুকের ভিতর এক অচল আমি, আমার স্মৃতির বারান্দায় আমি চুপচাপ বসে থাকি।
ধীরে, ধীরে আমার পা অবশ হয়ে আসে,
গাছের মোটা গুড়ির মতোই জীবনের মাঠে, পড়ে থাকি।
কেউ রাখে না খোঁজ, ধীরে ধীরে পচন ধরে,
বাকল উঠে গেছে, দু’একটা ঝিঁঝি বুকে আশ্রয় নেয়, না কুরে কুরে খায়?
রোজ আমায়- জানা নাই।
আমি কখনো প্রেম করতে চাইনি, সে ছোটবেলা থেকেই আমার ছুঁত, ছুঁত লাগে।
তবুও কেন বুকের ভেতর, এক একটু “রুদ্র” বেড়ে উঠে।
কী ভীষণ জ্বালাতন, কতো কষ্ট, কষ্ট লাগে।
কই, আমি তো তাঁকে, কখনো ভালোবাসি বলিনি।
বলিনি ছুঁয়ে দাও- চুম্বক ঠোঁট।
তবুও কেন একা একা লাগে?
কেন অবেলায় বুকের ভেতর মোচড়ে মোচড়ে উঠে?
কেন কেউ আমায় পোড়ায় অদৃশ্য আগুনে?
কোন অপরাধে আমার হৃদয় আমার সাথে আর কথা কয় না?
কেন কেউ আমায় আর আমার “কে হও তুমি?”
এ প্রশ্ন করে না। আমার তো কেউ নেই,
থাকবার কথাও নয়, তবুও কেন মন পোড়ায়।
চোখ টাটায়। কিসের এমন তৃষ্ণা? কে আমায় আমার
হতে দেয় না? কেন বুকে দুখের পাহাড় জমে। আমার
তো সব ছিলো, সব আছে। তবুও কেন না পাওয়া আমায় কাঁদায়?
ক্ষমা করো-
ক্ষমা করো- আমি কখনো চাইনি একটা “রুদ্র” আমার হোক।
বড়ো প্রেম প্রেম লাগে, বড়ো অবেলায়।
কি এক অসুখের সুখে, আমি শয্যাশায়ী।
কে ডাকে আমায়, লোকের আড়ালে?
কে যেন, ঘুমঘোরে, “সকাল” বলে ডাকে।
সে তুমি কেমন তুমি? আমার জানা নাই।
শুধু বলি, ক্ষমা করো।
ক্ষমা করো আমায়।

উদ্বায়ী জীবন

বোহেমিয়ান জীবন এক,
বয়ে চলেছি দুঃখের পারাবার।
জানি, এক ভোরে পাখি উড়ে যাবে,
থাকবে না কোন পথ পালাবার।

তবুও, উদ্বায়ী জীবন বায়ু,
ভেসে বেড়ায় সীমাহীন চাওয়ার
এই-গলি, ওই-গলি।

পিছুটানে প্রেম, থমকে থামি;
চমক জাগে নির্লিপ্ত চোখে।
মন ভাবছে, এই তো জীবন;
এই তো সুখ।
কতোদিন পরে, পেয়েছি তাকে
হাতের মুঠোয়।

ভুল ভাঙে, ঘুম ভাঙে,
চেয়ে দেখি পথে হলো দেরি।
এভাবেই ভুলের থলে ভারী হয়ে আসে।
রোজ দেরি করে বাড়ি ফিরি।

তুমি জানো

সবুজ পাখি জানে,
কত দুঃখ দানা বেঁধে
হৃদয়ে চড়ে বসেছে।
কিন্তু তুমি জানলে না।

এখানেও ভোর হয়,
ফুলের সঙ্গে ফুল কথা বলে,
অলি হাসে,
নদীর বুক চিরে তিরতির ভেসে বেড়ায়,
একটা, দুইটা বালি হাঁস।
তীরে ডিম পাড়ে,
কতেক ডুবে যায় অথৈ জলে—
আমি চোখে মেলে দেখি,
কালো পানকৌড়ি গড়ে তুলে
জলের সঙ্গে মিতালি।

এখনও ছায়া বানীতে
সন্ধ্যের শো-তে ভিড় জমে।
কফির কাপে, ঠোঁটে ঠোঁটে কথা হয়,
কথা হয় চার চোখে—
আমি জানি, তুমিও জানো।

এখানে এখনও ফুটে আকাশমনি।
লিলুয়া বাতাসে দোলে উঠে
তোমার নীল শাড়ি।
আমি জানি, তুমি জানো—
আমি চায়ে চিনি মিশাই না,
কুড়মুড়ে হাফ টোস্টে দাঁত গেঁথে
অস্বস্তিকর শব্দ তুলে
তোমার কাঁচা ঘুম ভাঙাই না।

এখনও কলেজের ক্লাস শেষে
আমি সোজা বাড়ি ফিরি,
সন্ধ্যায় ৬/৭ ছাত্র পড়াই,
রাত ১০টায় টেবিলে ঢাকনা দেয়া
ঠান্ডা ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।

আমি জানি, তুমি সব জানো।
শুধু জানো, মাঝরাতে বুকের ভেতর
কেমন শীতল ব্যথা চেপে বসে।
আমি জানি, তুমি জানো।

*সোমা ঘোষ মণিকা: ১২৯, কালীবাড়ি রোড,  ময়মনসিংহ। 

You cannot copy content of this page